Saturday, September 29, 2018


পাহাড়ের রানীর সাথে সাক্ষাৎ

ঘুরতে যাব তাও আবার দেশের বাইরে এটা নিয়ে কতই না জল্পনা কল্পনা। প্ল্যান হল
দার্জিলিং যাব। দার্জিলিং কে বলা হয় “The Queen of the Hills” পাহাড়ের রানী। সমগ্র
দার্জিলিং শহরটি খুব সুন্দর সবুজ একটা চাদরে নিজেকে ঢেকে রেখেছে পাহাড় এবং উদ্ভিদ
বৈচিত্রের কারণে। তিন বন্ধু মিলে আল্লাহর নাম নিয়ে রওনা দিলাম। আমরা এই বছর মার্চ
মাসেই গিয়েছিলাম। ঢাকা থেকে রাত ৮:৩০ মিনিটে এস আর ট্রাভেলস যোগে ৮৫০ টাকা
দিয়ে এসি বাসের টিকেট করে বুড়িমারির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। পরের দিন সকাল ৭:০০
টা বাজে বাংলাদেশী বর্ডার বুড়িমারি পৌছালাম এবং একে একে সব ভেরিফিকেশন শেষ করে
ভারতের চেংরাবান্ধা বর্ডারে প্রবেশ করলাম। সেখানেও সব ভেরিফিকেশন শেষ করে বর্ডারেই
টাকাকে রুপিতে রূপান্তর করে নিলাম। 




তারপর তিন বন্ধু মিলে ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু
করলাম। শেয়ারে অ্যাম্বেসেডর গাড়ি ভাড়া করে শিলিগুড়ির দিকে রওনা হলাম। শিলিগুড়ি
যেতে তিন জনের ভাড়া লেগেছিল ৭০০ রুপি (রিজার্ভ নিলে ১০০০-১২০০ রুপি পড়বে)।
শিলিগুড়িতে একটা হোটেলে দুপুরের খাবার শেষে জন প্রতি ১৫০ রুপি দিয়ে শেয়ার জিপের
টিকেট কেটে দার্জিলিং এর উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। শেয়ারড জিপের মাঝের সিট তিন জনের
হলেও চার জন বসানো হয়। তাই আমরা ঐ চার জনের সিট রিজার্ভ নিয়ে তিন জন
বসেছি। সারাটা পথ কি অপূর্ব সুন্দর! চারপাশে সবুজ আর সবুজ। মাঝে মাঝে ছোট ছোট
ঝর্না চোখে পড়ছিল। পাহাড়ের গায়ে ছোট ছোট বাড়ি। বাড়ির আঙ্গিনা গুলো নানান
রকমের ফুলে ভরা। 

এরা এত ফুল প্রেমী যা বলা বাহুল্য। পুরো শহর যেন রঙের
ছড়াছড়িতে মেতে উঠেছে। দার্জিলিং বাসীরা আসলে গোর্খা জাতি। বাংলাদেশ থেকেও
অনেকে এখানকার স্কুলে পড়তে আসে। মার্চ এর শুরু, তাই শীতের আমেজ কেবলই শেষ
হল। কিন্তু তখনও দার্জিলিং এ তাপমাত্রা পাঁচ ডিগ্রী সেলসিয়াস। সন্ধ্যায় হোটেলে পৌছানোর
পর ফ্রেশ হয়ে আবার বেড়াতে বের হই। সন্ধ্যা ৭-৮ টা নাগাদ প্রায় সব দোকানপাটই বন্ধ
হয়ে যায়। আমরা রাতে বের হয়ে ঘুম স্টেশন ঘুরে স্ট্রীট ফুড খেয়েছি। দার্জিলিং এর স্ট্রীট
ফুডের মধ্যে সর্ব পরিচিত ছিল মোমোস, থুকপা, আলুর দম, নেপালি থালি। থুকপা হল
একধরণের গরম নুডলস স্যুপ যা সবজি এবং মাংস দিয়ে পরিবেশন করা হয়। 



এরপর পরের দিনের জন্য ৪০০০ রুপি দিয়ে গাড়ি ঠিক করে রাত ১০টা নাগাদ হোটেল এর দিকে
যেই আগাচ্ছিলাম তখনই হঠাৎ আমাদের সাথে ঢাকার একজনের দেখা হয়ে গেল। বিদেশে
নিজ দেশী মানুষের দেখা পেলে মনে হয় যেন আনন্দটা দ্বিগুণ হয়ে গেছে। তার সাথে
আগামীকালের প্ল্যান শেয়ার করলে সেও আমাদের সাথে যেতে আগ্রহ প্রকাশ করে। পরে সব
কিছু ঠিকঠাক করে হোটেলে চলে আসি কারণ পরদিন খুব সকালে আবার টাইগার হিল
যাওয়ার জন্য বের হতে হবে।


দ্বিতীয় দিনঃ সকাল ৪:৩০ মিনিটে গাড়ী এসে আমাদের টাইগার হিল নিয়ে যায়। 









ভোর বেলার সূর্যোদয় আর তার সাথে কাঞ্চনজঙ্ঘার কি অপরূপ নয়নাভিরাম দৃশ্য! যা মুখে বলে
বা লিখে বুঝানো যাবে না। যা শুধু অনুভবই করা যায়। তারপর সরাসরি আমরা চলে
গেলাম কালিম্পং এর ডেলো হিল এর দিকে প্যারাগ্লাইডিং এবং রাফটিং করার জন্য। পথেই
আমরা সকালের নাস্তা সেরে নিলাম করণ আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল সময় বাঁচাতে হবে।
অবশেষে কাঙ্ক্ষিত ডেলো হিলে পৌছালাম।



বলে রাখা ভালো যে, প্যারাগ্লাইডিং করার সময় তারা আপনাকে জিজ্ঞেসা করবে ভিডিও সহ করবেন না ভিডিও ছাড়া? কারণ ভিডিও সহ করলে খরচ একটু বেশি পড়ে। চার জন থাকায় আমাদের প্রত্যেকের ভিডিও সহ খরচ পরেছিল ২৬০০ রুপি। প্যারাগ্লাইডিং করার সময় নিজেকে পাখির মত মনে হচ্ছিলো একটাপাখি উপর থেকে পৃথিবীকে যে দৃষ্টিতে দেখে ঠিক তাই আমি অনুভব করছিলাম। ডানামেলে আমি যেন শূন্যে হারিয়ে যাচ্ছি। খুব সুন্দর অনুভুতিতে আমার মন আছন্ন হয়ে
রয়েছিল। প্যারাগ্লাইডিং শেষে আমরা চলে গেলাম রাফটিং করতে। তিস্তা নদীর বরফ গলা
পানিতে রাফটিং করা এক অসাধারণ এডভেঞ্চার। যখন বরফ গলা পানি আপনার দেহে
পড়বে তখন পুরো শরীর যেন হিম হয়ে যাবে; সে এক অন্য রকম অনুভূতি। রাফটিং
করতে আমাদের চার জনের খরচ পরেছে ৪৫০০ রুপি এবং রাফটিং এর ফটোশুট এর জন্য
ক্যামেরা ম্যান এর ফি ছিল ৯০০ রুপি। একটা রাফটিং বোট এ ৫ জন বসতে পারে।
রাফটিং দুই রকমের ছিল, ছোট রাইড (৩৫০০ রুপি) এবং বড় রাইড(৪৫০০ রুপি)।
রাফটিং শেষে একে একে ক্যাকটাস গার্ডেন এবং বাতাসিয়া লুপ দেখে হোটেল এ ফিরলাম।
তারপর রাতে বের হয়ে টুকিটাকি শপিং করে, স্ট্রীট ফুড খেয়ে আমাদের নতুন ঢাকার
বন্ধুকে বিদায় জানাই করণ তার আবার পরদিন মানালি যেতে হবে। এই নতুন দেশী বন্ধুর
সাথে সফরটা অনেক ভালো কেটেছিল। অবশেষে, হোটেলে ফিরে ব্যাগ গুছিয়ে ফেললাম
কারণ পরের দিন সকাল সকাল আমাদের সান্দাকফুর জন্য রওনা দিতে হবে।

তৃতীয় দিনঃ সকাল ৭টা বাজে আমরা তিন বন্ধু মিলে চলে গেলাম জিপ স্ট্যান্ড। সেখানে
সকালের নাস্তা সেরে মানেভেঞ্জান এর উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। দার্জিলিং থেকে মানেভেঞ্জান
যাওয়ার জিপ ভাড়া প্রত্যেকের ৭০ রুপি। কিন্তু গাড়ি ফুল রিজার্ভ না হলে গাড়ি ছাড়ে না।
তাই আমরা ৩০০ রুপি বেশি দিয়ে যে সিট গুলো খালি ছিল সেগুলো রিজার্ভ করে রওনা
হলাম মানেভেঞ্জান পথে। মানেভেঞ্জান পৌঁছানোর পর সান্দাকফু যাওয়ার জন্য জিপ ভাড়া
করলাম। জিপ ভাড়া নির্ভর করে রাতে থাকার উপর। রাতে থাকলে ভাড়া ৪৮০০ রুপি
এবং দিনে গিয়ে দিনে ফেরত আসলে ৪৩০০ রুপি। সান্দাকফু ট্রেকিং করেও যাওয়া যায়।
ট্রেকিং করে যেতে ৩-৪ দিন সময় লাগে। ট্রেকিং করে যাওয়া বেশি নিরাপদ জিপ এ
যাওয়ার থেকে। আর জিপ এ যাওয়া পুরোই এডভেঞ্চারে ভরা। রাস্তা ছিল ভয়ানাক এবড়ো
থেবড়ো, আঁকাবাঁকা, এক কথায় যত বিশেষণ দিব ততই কম। সান্দাকফু যাওয়ার পথটা
গিয়েছে সিঙ্গালিলা সাফারি পার্কের মধ্য দিয়ে। সাফারি পার্ক এর টিকেট জনপ্রতি ২০০ রুপি


এবং ক্যামেরার জন্য ১০০ রুপি। সান্দাকফু যাওয়ার পথে আমরা মাঝে অনেক জায়গায়
নেমেছি ছবি তোলার জন্য। তার মধ্যে অন্যতম হল কালাপখ্রি লেক, যা সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে
১০৪৫৩ ফুট উপরে অবস্থিত। সান্দাকফুর যাওয়ার পথটা ভারত ও নেপালের সংমিশ্রনে
ভরা। অবশেষে, কঠিন রাস্তা পার হয়ে বিকাল ৪টা বাজে আমরা যখন সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে
১২০০০ ফুট উপরে সান্দাকফু পৌছালাম তখন ঘন মেঘের আনাগোনার খেলা চলছিল।
সান্দাকফু হল দার্জিলিং এর সবচেয়ে উঁচু চূড়া। কি সুন্দর পরিবেশ! প্রকৃতি যেন এক অনন্য
নিশ্চুপ রুপ ধারণ করেছিল। মেঘের জন্য বিকেলে হিমালয়ের সারি দেখা যাচ্ছিল না।
তারপর ঐখানে নেপালি, বাঙ্গালি, অস্ট্রেলিয়ান, সবার সাথে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত আড্ডা
আর গরম গরম চা এর সাথে মোমোস খাওয়া হল। সান্দাকফু তে রুম খরচ ছিল ৮০০
রুপি। এক রুম এ তিনজন থাকা যায়। কিন্তু পানি খুব কম ব্যাবহার করা যাবে শুধু হাত
মুখ ধোয়া আর টয়লেট এর জন্য। গোসলের কোন ব্যবস্থা নেই। আর রাতের তাপমাত্রা ছিল
শূন্য ডিগ্রী সেলসিয়াস। কি যে ভয়ানক ঠাণ্ডা বলার মতন না! কোন রকম রাত পার করা
ছিল মুখ্য উদ্দেশ্য। এখন আসি আসল এবং সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত অংশে, যার জন্য দার্জিলিং
আসা। ভোর ০৫ টা বাজে ঘুম ভেঙ্গে যায়। তারপর বরফের মত ঠাণ্ডা পানি দিয়ে মুখ
ধুয়ে বেরিয়ে পরলাম কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে। 

যার অসাধারণ সৌন্দর্য দেখে নিজের চোখকে
বিশ্বাস করাতে পারছিলাম না। আল্লাহ পাককে সারাক্ষণ ধন্যবাদ দিয়েছি এবং শুকরিয়া
আদায় করেছি। কাঞ্চনজঙ্ঘা, এভারেস্ট, মাকালু, থ্রি সিস্টার্স, কুম্ভকর্ণ, আরও অনেক অনেক
হিমালয়ের পর্বতের দেখা মিলল। সান্দাকফুর সবচেয়ে নজরকাড়া দৃশ্য ছিল লাইং বুদ্ধা যা
অনেক গুলো পর্বত নিয়ে গঠিত। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন গৌতম বুদ্ধ শুয়ে আছেন।
তখন কি আর শীতের কথা মনে থাকে! তখন শুধু মনে হচ্ছিল মনের ক্যামেরায় আর
ডিএসলারে সব দৃশ্য তুলে ধরে রাখি। তারপর সকাল ৮:৩০ মিনিটে আমরা পুনরায়
মানেভেঞ্জান এর উদ্দেশ্যে রওনা হই। পরে দার্জিলিং পৌছে ৫০০ রুপি দিয়ে ট্যাক্সি রিজার্ভ
করে একে একে তেঞ্জিং রক, এবং চা বাগান ঘুরে জিপ স্ট্যান্ড আসি। চা বাগানে ৫০
রুপি দিয়ে দার্জিলিং এর পোশাক ভাড়া পাওয়া যায় ছবি তোলার জন্য। দার্জিলিং এ চাপাতা
এবং শীতের কাপড়ের দাম তুলনামূলক কম। সেদিনই বিকালে আমরা মিরিক এর উদ্দেশ্যে
রওনা হলাম। সন্ধ্যা বেলা মিরিক পৌছে কিছুক্ষণ হোটেল খুজতে হয় কারণ কিছু হোটেল
বাঙ্গালিদের ভাড়া দিতে চায় না। পরে আশপাশ ঘুরে একটা হোটেলদুই
জনের এক রুমের ভাড়া পরেছিল ৫০০ রুপি।
চতুর্থ দিনঃ সকালে ঘুম থেকে উঠে আশপাশ ঘুরে মনেস্ট্রি দেখলাম। তারপর মিরিক লেক
ঘুরে সকালের নাস্তা সেরে আবার শেয়ারে জনপ্রতি ১০০ রুপি জিপ ভাড়া দিয়ে রওনা হলাম
শিলিগুড়ির উদ্দেশ্যে। পথে চা পাতা কিনলাম কারণ দার্জিলিং চা এর জন্য বিখ্যাত।
শিলিগুড়ি পৌছে বিগ বাজার থেকে শপিং করলাম। এখন দেশে ফেরার পালা। শিলিগুড়ি
ট্যাক্সি স্ট্যান্ড থেকে ১২০০ রুপি দিয়ে গাড়ি রিজার্ভ নিয়ে আমরা চলে আসলাম চেংরাবান্ধা
বর্ডারে। বর্ডার থেকে চকলেট কিনে নিলাম পরিবার ও বন্ধুদের জন্য। অবশিষ্ট রুপি কে

টাকায় রূপান্তর করার পর একে একে সব ফর্মালিটি শেষ করে আমরা বুড়িমারি বর্ডার দিয়ে
বাংলাদেশে প্রবেশ করলাম। বাংলাদেশে প্রবেশের পর শান্তির একটা নিঃশ্বাস নিয়ে বুড়ির
হোটেল গিয়ে মুরগির মাংস, ডাল আর সালাদ দিয়ে যে ভাত খেলাম, মনে হল কতদিন
আমরা না খেয়ে আছি। খাওয়া শেষ করে একটু বিশ্রাম নিয়ে পূর্বে বুকিং করা এস আর
ট্রাভেলসের এসি বাসে করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।
আমি চেস্টা করেছি যতটা সম্ভব আপনাদের সামনে খরচ গুলো তুলে ধরার। আমাদের
প্রত্যেকের খরচ পরেছিল ১৮০০০/- বাংলাদেশী টাকার মত। এই টাকার মধ্যে রয়েছে
উপরের বর্ণিত খরচ সমূহ ছাড়াও ভিসা ফি, ট্র্যাভেল ট্যাক্স, খাবারের খরচ আর ইচ্ছে মত
লেইস চিপস এবং ক্যাডবেরি চকলেটের খরচ।

সতর্কতা ও টিপসঃ মনে রাখবেন বিদেশে গিয়ে যাতে দেশের মান কোন ভাবেই নষ্ট না হয়।
কোন প্রকার মাদক দ্রব্য বহন করবেন না। দার্জিলিং এ প্রকাশ্যে ধূমপান করলে জরিমানার
বিধান আছে। আর সাথে সবসময় পাসপোর্ট, ঔষধ, গরম কাপড়, ছাতা/রেইন কোট রাখবেন।
যেখানে সেখানে ময়লা ফেলে পরিবেশ নষ্ট করবেন না।